Wednesday, 2 January 2013

লোহা সৃষ্টির মূলতত্ত্ব ও কুরআন


                                                                         
লোহা একটি মৌলিক পদার্থ যার পারমাণবিক সংখ্যা ২৬ এবং রাসায়নিক সংকেত Fe। এটি এক প্রকারের ধাতু। ধাতুগুলির মধ্যে প্রাচুর্যের দিক থেকে প্রকৃতিতে অ্যালুমিনিয়ামের পর দ্বিতীয় স্থান লোহার। তবে পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুর অংশটি লোহার তৈরী বিধায় সেটাকে হিসাবে আনা হলে পৃথিবীতে লোহার পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। তবে খাঁটি লোহা প্রকৃতিতে বিরল।

আমরা অনেকেই মনেকরি অতি পরিচিত মৌল লোহার কোন বিশেষত্ব নেই। এটি পৃথিবীতেই অন্যান্য পদার্থের মত সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আমাদের ধারনা সম্পূর্ণ ভুল। পৃথিবী তো দুরের কথা খুদ সৌরজগতের কোন স্থানে লোহার একটি অণুও সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। তাই লোহা পৃথিবীর অভ্যন্তরে সৃষ্টি হওয়া কোন পদার্থ নয় বরং এটি এসেছে পৃথিবীর বাইরে থেকে।
সর্বপ্রথম ১৮৪৭ সালে বিজ্ঞানি জুল ও রামফোর্ড তাপ গতি বিদ্যার ১ম সূত্র(the 1st low of thermodynamics) প্রদান করেন। পরবর্তীতে এই সূত্রের উপর ভিত্তি করে অণুর গঠন সংক্রান্ত সূত্র, Enthalpy of formation বা গঠন এনথালপি প্রদান করা হয়। যার প্রাসঙ্গিক মূল কথাটি হল- কোন পদার্থকে তার গঠন উপাদান সমূহ থেকে তৈরি করতে হলে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপের পরিবর্তন করতে হবে। অন্যথায় পদার্থটি উৎপন্ন হবে না। যেমন, মাত্র ১ মোল কার্বনডাইঅক্সাইড তৈরি করতে হলে ন্যূনতম ৩৯৩.৫ কিলোজুল (১কিলোজুল=১০০০জুল ) নির্গত হতে হবে। মানে  কার্বনডাইঅক্সাইডের গঠন এনথালপি ৩৯৩.৫ কিলোজুল।
একইভাবে মাত্র ১ মোল পানি উৎপন্ন  করতে ২৮৬.৫ কিলোজুল তাপ নির্গত হওয়া অত্যাবশ্যক। কারন পানির গঠন এনথালপি ২৮৬.৫ কিলোজুল। তাই বুঝা গেল বস্তুভেদে গঠন এনথালপি বিভিন্ন। লোহার ক্ষেত্রে এটি এতই বেশি যে পৃথিবী তো দুরের কথা খুদ সৌরজগতের কোন স্থানে লোহার একটি অণুও সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়।
লোহা অণুর গঠণ প্রসঙ্গে প্রফেসর আর্মস্ট্রংক বলেন- সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মৌলিক পদার্থের গঠন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। লোহার একটি অণু তৈরি করতে যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন তা এতই বেশী যে সমগ্র সৌরজগতের শক্তিও এর জন্য পর্যাপ্ত নয়। তারা হিসাব করে দেখান যে লোহার একটি অণু তৈরি করতে সৌরজগতের  মোট শক্তির চারগুণ শক্তি প্রয়োজন। কাজেই বিজ্ঞানীরা বর্তমানে বলছেন যে, লোহা পৃথিবীতে সৃষ্ট কোন পদার্থ নয়, লোহা এসেছে পৃথিবীর বাইরে থেকে (extra terrestrial metal)। লোহা কেবলমাত্র সূর্যের চেয়ে বড় কোন নক্ষত্রেই তৈরী হতে পারে যেখানে তাপমাত্রা কোটি ডিগ্রির কাছাকাছি। এ রকম কোন গলিত নক্ষত্রের বিস্ফোরনের মাধ্যমেই লোহার উৎপত্তি সম্ভব।

অর্থাৎ লোহা পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি এসেছে আকাশ থেকে। এটিই হচ্ছে বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক বক্তব্য। এবার আপনাদের এমন একটি তথ্য প্রদান করবো যা শুনে আপনাদের চোখ কপালে ওঠে যাওয়ার উপক্রম হবে। তথ্যটি হল, লোহার আগমন ও এর অভাবনীয় শক্তি সম্পর্কিত বিজ্ঞানের করা সাম্প্রতিক বক্তব্যটি আজ থেকে ১৪০০ বছর পূর্বে একটি গ্রন্থে সুস্পষ্ট ভাবে আলচনা করা হয়েছে। অবাক হচ্ছেন! অবাক না হওয়ারই বা কারন কি? যেখানে আজ থেকে মাত্র ১৬৫ বছর পূর্বে(১৮৪৭ সালে) বিজ্ঞানি জুল ও রামফোর্ড কর্তিক তাপ গতি বিদ্যার ১ম সূত্র(the 1st low of thermodynamics) প্রতিষ্ঠা লাভ করে, সেখানে আজ থেকে ১৪০০ বছর পূর্বে লোহা অণুর জটিল গঠন পক্রিয়া, অণুটির আভ্যন্তরীণ বিপুল শক্তি ভাণ্ডার, এই মৌলটি পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি, এটি এসেছে আকাশ তথা সৌর জগতের বাইরে থেকে, এইসব জটিল তথ্য গুলো প্রদান করা কি করে সম্ভব?
এর উত্তর হচ্ছে- ১৪০০ বছর পূর্বে যে গ্রন্থে এই মহাসূক্ষ্ম বিষয়গুলো সম্পর্কে তথ্য প্রধান করা হয়েছে নিঃসন্দেহে ঐ গ্রন্থটি মানব রচিত কোন স্বাভাবিক গ্রন্থ নয়। কারন মানুষ মাত্র কিছুদিন আগে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছে। তাই এই গ্রন্থটির উৎস স্বয়ং স্রষ্টা নিজেই। পবিত্র কুরআনের ৫৭ নং সুরা আল হাদিদের ২৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “আল্লাহ লোহা পাঠিয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ”।
ব্যাখ্যাঃ আয়াতটিকে তিনটি অংশে ভাগ করে ব্যাখ্যা প্রধান করা হল।
১]আল্লাহ লোহা পাঠিয়েছেন।
  •  ব্যাখ্যাঃ এই অংশটিতে আরবি ‘‘আনঝালা’’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ প্রেরণ করা বা আকাশ থেকে অবতীর্ণ করা। বিশেষত আকাশ থেকে বা পৃথিবীর বাইরে থেকে প্রেরণ করা অর্থে আরবি আনঝালা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তার মানে লোহা পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি এসেছে পৃথিবীর বাইরে থেকে।
২] যার মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি।
  • ব্যাখ্যাঃ  এই অংশটিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় লোহার আভ্যন্তরীণ বিপুল শক্তি ভাণ্ডার ও এর গঠন পক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় অপার্থিব শক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
৩] এবং রয়েছে মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ।
  • ব্যাখ্যাঃ  এই অংশটিতে মহান আল্লাহ জানিয়েছেন লোহা খুবই উপকারী ধাতু। যা মানুষের বহুবিধ কল্যান সাধন করতে পারে। লোহার এইসব উপকারীতার কথাই আল্লাহ প্রকাশ করেছেন।
এবার নিজেই পরখ করে দেখুন লোহা সম্পর্কে ১৪০০ বছর পূর্বে কুরআনে প্রদত্ত তথ্যগুলোর সাথে বর্তমান বিজ্ঞানের সামান্যতম অমিল খুজে পান কি না? জানি পাবেন না! কারণ কুরআন ও বিজ্ঞান যেন একই উৎস হতে নির্গত দুটি আলোক রশ্মি। যাদের ধারা ভিন্ন কিন্তু উৎসমূল এক। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আমাদের পৃথিবীর একদম মধ্যবর্তী স্থানটি অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্র লোহার তৈরি। সূরা হাদিদ (হাদিদ অর্থ লোহা) কোরআনের ঠিক মধ্যখানে অবষ্থিত। কুরআনে মোট ১১৪ টি সূরা আছে। সূরা হাদিদ কুরআনের ৫৭ নং সূরা। অর্থাৎ সূরা হাদিদের অবস্থান একেবারে মধ্যখানে।
চমক এখানেই শেষ হয়নি। আরো আছে। এবার আপনাদের সামনে লোহার জটিল রাসায়নিক গঠন ও লোহা পরমাণুর মধ্যে অবস্থিত মৌলিক কনিকার সংখ্যা সম্পর্কিত কুরআনের দেয়া নির্ভুল তথ্য সম্পর্কে আলোচনা করব।
লোহার এটমিক নাম্বার বা পারমাণবিক সংখ্যা ২৬। ‘হাদিদ’ শব্দটির সংখ্যাগত মানও হল ২৬। (হা=৮, দাল=৪, ইয়া=১০, দাল=৪),  যখন আমরা বিসমিল্লাহ  (শুরুর আয়াত) কে আয়াত ধরি, তখন যে আয়াতে ‘লোহাকে পাঠানো হয়েছে’ উল্লেখ করা হয়েছে তা ২৬ তম আয়াতে উপনীত হয়। যেহেতু কোন মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা সমান ঐ পরমাণুর প্রোটন ও ইলেকট্রন সংখ্যা। তাই লোহার পারমাণবিক সংখ্যা ২৬ হওয়ায় লোহা পরমাণুর অভ্যন্তরে ২৬টি প্রোটন ও ২৬টি ইলেকট্রন আছে। আবার আমরা জানি, লোহা পরমাণুর নিঊক্লিয়াসে অবস্থিত নিউট্রন সংখ্যা ৩০।
যেহেতু সূরা হাদিদের শুরুতে  বিসমিল্লাহ পড়তে হয়,(সুরা তাওবা ছাড়া সকল সুরার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়তে হয়) তাই বিসমিল্লাহ সহ সুরা হাদিদের আয়াত সংখ্যা ৩০,যা লোহার নিউট্রন সংখ্যা নির্দেশ করে। যখন কুরআনই সর্বপ্রথম (পরোক্ষভাবে গাণিতিক নিয়মে) লোহার পারমাণবিক সংখ্যা, প্রোটন সংখ্যা, ইলেকট্রন সংখ্যা ও নিউট্রন সংখ্যা সম্পর্কে তথ্যপ্রধান করেছে তখন তার ভরসংখ্যা বাদ যাবে কেন?
ইতিমধ্যে আমরা কুরআনের দেয়া তথ্য হতে জানতে পেরেছি লোহার প্রোটন সংখ্যা=২৬ ও নিউট্রন সংখ্যা=৩০, এবার এবার কুরআনের দেয়া তথ্য হতে ভরসংখ্যা বের করা যাক। আমরা জানি, ভরসংখ্যা= প্রোটন সংখ্যা+নিউট্রন সংখ্যা। অতএব লোহার ভরসংখ্যা= ২৬+৩০=৫৬, আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানও বলছে লোহার ভরসংখ্যা=৫৫.৮৫ বা ৫৬,  কি আশ্চর্যের বিষয়!  আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বেই মহান স্রষ্টা স্বীয় অনুগ্রহে তার সৃষ্টিকুলকে শুধু পরমাণু সম্পর্কেই অবহিত করেননি বরং এর অভ্যন্তরে অবস্থিত অতিসূক্ষ্ম কণিকাগুলো সম্পর্কেও  অবহিত করেছেন। কিন্তু মানবকুলের বড় দুর্ভাগ্য তারা কুরআন কে যথাযত মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় ১৪০০ বছর পূর্বে পরিবেশিত এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মাত্র কিছুদিন পূর্বে আবিস্কার করেছে।
সর্বপ্রথম ১৮০৩ সালে জন ডাল্টন কর্তৃক পরমানুবাদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখনো পরমানুর অভ্যন্তরে অবস্থিত মহাসূক্ষ্ম কণিকাগুলো সম্পর্কে মানুষ কল্পনাও করতে পারতো না। তখন পর্যন্ত মানুষ জানত যে- পরমাণুই হচ্ছে পদার্থের সবচেয়ে ক্ষুদ্র ইউনিট। অর্থাৎ ইলেকট্রন, প্রোটন,নিউট্রন সহ অন্যান্য মৌলিক কণিকাগুলো সম্পর্কে মানুষ জানতনা। পরবর্তীতে এগুলো আবিষ্কৃত হয়ে কুরআনের সত্যতা প্রমাণ করেছে মাত্র। কুরআন এভাবে অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য পরোক্ষভাবে গাণিতিক নিয়মে প্রকাশ করেছে। যার আরো একটি উদাহরণ পেশ করছি।
বর্তমান বিজ্ঞান নিরীক্ষনের মাধ্যমে দেখিয়েছে পৃথিবীতে স্থলভাগের পরিমাণ, মোট আয়তনের ২৯ ভাগ আর জলভাগের পরিমান ৭১ ভাগ। আরো ভাল ভাবে বললে ২৮.৯ ভাগ স্থল আর ৭১.১ ভাগ জল। এই তথ্যটি পবিত্র কুরআনেই সর্বপ্রথম বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনে এমন একটি আয়াত কি কেউ দেখাতে পারবেন যার অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর জলসীমা ৭১.১% আর স্থলসীমা ২৮.৯%,তাহলে কিভাবে এই তথ্যটি কুরআন পেশ করল? আবার দেখুন কুরআনের গাণিতিক মিরাকল!!!
কোরআনে সমুদ্র বা জলাধার শব্দটি এসেছে ৩২ বার।
ভুমি বা জমি শব্দটি এসেছে ১৩ বার।
এদের রিপিটেশন এর পরিমানকে অনুপাতে প্রকাশ করলে পাওয়া যায়-
স্থলভাগের পরিমাণ = {১৩/(১৩+৩২)}=২৮.৯%
জলভাগের পরিমান = {৩২/(১৩+৩২)}=৭১.১%
এই বিষয়টিকে কি করে কাঁকতলিয় বলে উড়িয়ে দেবেন? এরপরও যদি কেউ বলে যে এগুলো কাকতালীয় ঘটনা? তবে আমার আর কিছুই বলার নাই! শুধু তাদের উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করছি ‘‘কোন ব্যাক্তিই আল্লাহর অনুমতি ব্যাতিত ঈমান আনতে পারে না। আর আল্লাহর নিয়ম এই যে, যাহারা বিবেক বুদ্ধি প্রয়োগ করে না, তিনি তাদের উপর অপবিত্রতা চাপিয়ে দেন(সূরা ইউনুস-১০০)’’
ভাবতেও অবাক লাগে এত সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও মানুষ কেন নাস্তিকতার দিকে ঝুকে পড়ে? সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেন মিথ্যা স্রষ্টার উপাসনা করে? সত্যের শাশ্বত পথ বাদ দিয়ে কেন মিথ্যার পথে পা বাড়ায়?        

তবে এসব বিষয় নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাবেন না। সব সময় মনে রাখবেন- মিথ্যা আছে বলেই তো সত্যের এত দাম! অন্ধকার আছে বলেই তো আলোর কদর এত বেশি! নাস্তিকতা ও মিথ্যা স্রষ্টায় বিশ্বাসী লোক আছে বলেই তো মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনে বিশ্বাসী লোকদের জন্য রয়েছে আকাশ ও জমিনের মত বিস্তৃত জান্নাত। পরিশেষে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত উল্লেখ করে আজকের মত এখানেই শেষ করছি- ‘‘‘দৌড়ে এসো ছুতে এসো তীব্র গতিতে সেই পথে, যে পথে রয়েছে তোমার প্রভুর মাগফিরাত(ক্ষমা), যে পথ গিয়ে মিশেছে আকাশ ও জমিনের মত বিস্তৃত জান্নাতে। যা তৈরি করা হয়েছে কেবলমাত্র আল্লাহকে ভয়কারী বান্দাদের জন্য।’’’

#### হাফিজ তাহমিদ হাসান। 

Friday, 12 October 2012

রহস্যে ঘেরা ব্লাকহোল


রহস্যে ঘেরা ব্লাকহোল
হাফিজ তাহমিদ হাসান।

মানব সভ্যতার উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বিজ্ঞানের। বিজ্ঞানের কল্যাণেই মানুষ একের পর এক অজানা বিষয় গুলোকে জয় করছে। ঐ অজানা বিষয় গুলোর অন্তর্নিহিত রহস্য উদঘাটন করছে।. বিজ্ঞানের প্রধান কাজ গুলোর একটি হচ্ছে অজানা বিষয় গুলোর রহস্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগেও এই মহাবিশ্বের অনেক বিষয়গুলোর  রহস্য এখনো উন্মোচিত হয় নি।যেসকল বিষয়ে  বিজ্ঞান এখনো অন্ধকারে রয়েছে তাদের মধ্যে একটি হল ব্লাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর। কি এই ব্লাকহোল? কেমন এর গঠন প্রণালী? কি ঘটছে এর ভিতর? এর মধ্যে পতিত বস্তু ও শক্তির শেষ পরিণতই বা কি? এরকম হাজারটা প্রশ্নের কোন সঠিক জবাব বিজ্ঞানের কাছে নেই। এ ব্যাপারে বিজ্ঞান বড়ই অসহায়। কারন ব্লাকহোলকে কখনই দেখা যায়না। শুধু এর চার পাশের Even horizon থেকে মুক্ত X-ray এর অস্তিত্ত থেকেই এর অবস্থান নিশ্চিত করা যায়। যারা অহংকার করে দাবী করেন যে, মানুষ চাইলে সকল বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং সকল কিছুই করতে পারে। মানুষ সব ধরনের সীমাবদ্ধতাকে জয় করতে পারে সুতরাং মানুষ সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। ব্লাকহোল তাদের এই দাবীকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করেছে। আসলে মানুষ অনেক কিছুই অর্জন করতে পারে তবে সকল কিছুই নয়। মানুষের অবশ্যই সীমাবদ্ধতা আছে এবং চিরকালই তা থাকবে। মানুষ কখনোই এই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারবেনা। তাইতো আধুনা বিজ্ঞান ব্লাকহোল সম্পর্কে তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলছে- what is inside a black hole? it is impossible to tell. you will never be able to see inside a black hole and you can never know. তাই না এর ভিতরের দৃশ্য দেখা যাবে না এর প্রকৃত রহস্য জানা যাবে। যেখানে মানুষ ব্লাকহোল সহ স্রষ্টার অসংখ্য সৃষ্টিকে দেখার সামর্থ্য রাখেনা এবং এর রহস্য উদঘাটনেও সমর্থ নয় সেখানে কি করে ঐ রহস্যময় সৃষ্টি গুলোর স্রষ্টাকে না দেখার অজুহাতে অস্বীকার করতে পারে? এগুলোতো আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছুই নয়।
এবার আসা যাক ব্লাকহোল প্রসঙ্গে। এই মহাজাগতিক বস্তুটির নাম ব্লাকহোল হওয়ার কারন হল, Absolutely no information passes out of black hole and that is why it is black। অর্থাৎ- ‘প্রকৃতপক্ষে এর ভিতর থেকে কোন প্রকার তথ্যই লাভ করা যায় না। এ কারনেই এটি চির আন্ধকার’। ব্লাকহোল এর ভয়ঙ্কর রুপ এবং অকল্পনীয় ধ্বংস ক্ষমতা মানুষের জানামত সকল প্রকার Adventureকেও হার মানায়। প্রতিটি গ্যালাক্সীতেই ব্লাকহোল এর অস্তিত্ব আছে। এক একটি ব্লাকহোলের আয়তন আমাদের স্বৈরজগত থেকেও বড় হতে পারে। বিজ্ঞানিদের ধারনা ব্লাকহোল জন্ম নেয় নক্ষরগুলোর ধ্বংসাবশেষ থেকে। এ নক্ষরগুলো সাধারনত সূর্যের তুলনায় ৩০ থেকে ১০০ গুন বড় হয়ে থাকে। ঐ নক্ষরগুলো যখন ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে চলে যায় তখন ব্লাকহোল এর সৃষ্টি হয়। তবে শর্ত হচ্ছে ব্লাকহোল সৃষ্টির জন্য নক্ষরটি সূর্যের তুলনায় কমপক্ষে ৩০ গুন বড় হতে হবে। নতুবা তা বিস্ফোরণ এর মাধ্যমে নিউট্রনস্টার বা পালসার তৈরি করবে। ব্লাকহোল তৈরি করতে পারবেনা। যেহেতু নক্ষত্রের ধ্বংসের মাধ্যমে ব্লাকহোল সৃষ্টি হয় তাই একে নক্ষত্রের মৃত্যুকুপ বা নক্ষর পতনের স্থান বলা হয়। ব্লাকহোল তার আশেপাশের সকল বস্তুকে প্রচণ্ড বেগে টেনে নিয়ে আসে। তারপর প্রচণ্ড ঘনায়নের মাধ্যমে এর নাম নিশানাও মুছে ফেলে। এমনকি সবচেয়ে গতিশীল বস্তু আলোও এর হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না। বিজ্ঞানিদের ধারণা আমাদের বিশাল পৃথিবীকে এই ব্লাকহোল এর মধ্যে ছেড়ে দিলে তা এক সেকেন্ডের মধ্যে এক সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি ছোট বিন্দুতে পরিণত হবে। কি ভয়ঙ্কর এর ক্ষমতা! কোন কিছু এর ধারে কাছে আসলে আর রেহাই নেই, নির্ঘাত ধ্বংস। কোন কিছুই এর হাত থেকে বাঁচতে পারেনা। ভাবতেও অবাক লাগে আলো পর্যন্ত এর হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পারেনা। এমন অবিশ্বাস্য ভয়ঙ্কর সর্বনাশী মৃত্যুকূপের অভ্যন্তরে আসলেই কি ঘটে চলেছে তা মানুষের বোধগম্যের সম্পূর্ণ বাইরে। ১৮শ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ বিজ্ঞানি ‘জন মিচেল’ এবং ফরাসি বিজ্ঞানি ‘লা-প্লাস’ সর্বপ্রথম মহাকাশে ব্লাকহোল এর মত বস্তু থাকতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেন। যদিও এই অভিমতটি সেদিন বিজ্ঞান বিশ্ব‌ের মোটেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। ১৯৩৫ সালে ভারতীয় বিজ্ঞানি অধ্যাপক সুব্রামানীয়ম চন্দ্রশেখর ইংল্যান্ড এর এক বিজ্ঞান সভায় ব্লাকহোলের পক্ষে দৃঢ় ভাবে বক্তব্য তুলে ধরেন। তখনো তা প্রমানিত হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে স্যাটেলাইট ‘উহুরু’ (UROHO‌) মহাকাশে X-ray এর সন্ধান করতে গিয়ে ব্লাকহোল এর সন্ধান লাভ করে। মূলত ১৯৭০ সালেই প্রথম বিজ্ঞান কতিক ব্লাকহোল এর অস্তিত্ব প্রমানিত হয়।
অবাক করার মত তথ্য হচ্ছে আজ থেকে ১৪০০শ বছর পূর্বে অন্ধকার, অনুন্নত, কুসংস্কার আচ্ছন্ন যুগে একটি গ্রন্থে এই মহাবিস্ময়কর ব্লাকহোল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। অবাক হচ্ছেন! আজ থেকে মাত্র দেড়শত বছর আগেও যখন বিজ্ঞানিরা ব্লাকহোল‌ সম্পর্কে কল্পনাও করতে পারতেন না সেখানে আজ হতে ১৪০০ বছর পূর্বে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর মূর্খতার যুগে কিভাবে একটি গ্রন্থে এই বিস্ময়কর ব্লাকহোল সম্পর্কে আলোচনা করা হল। যেখানে আজও বিজ্ঞানিরা ব্লাকহোল সম্পর্কে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না? তবে পবিত্র কুরআনের সূরা ওয়াকেয়ার ৭৫ নং আয়াত পাঠ করেই দেখুন। যার অর্থ হল- শপথ সে পতন স্থানের যেখানে নক্ষত্র সমূহ ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ এখানে ব্লাকহোল এর শপথ নেয়া হয়েছে। মহাকাশে যে এমন কিছু মহাজাগতিক বস্তু আছে যারা নক্ষত্রকে ধ্বংস করতে পারে, অর্থাৎ মহাকাশে অবস্থিত তারকা মৃত্যুকূপের অস্তিত্ব এবং এর কাজ সম্পর্কে কুরআনই সর্বপ্রথম ধারণা দিয়েছে। বিজ্ঞান পরবর্তীতে আবিস্কার করে তা প্রমাণ করেছে মাত্র। ১৪০০ বছর পূর্বে কুরআনে বর্ণিত তারকা মৃত্যুকুপ বা নক্ষত্র ধ্বংসস্থান এবং বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত ব্লাকহোল এর মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি? আজ থেকে মাত্র দেড়শত বছর পূর্বেও যেখানে মানুষের কল্পনার রাজ্যও ব্লাকহোল পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারেনি সেখানে আজ থেকে দেড়হাজার বছর পূর্বে কুরআন ব্লাকহোল সম্পর্কে আলোচনা করে প্রমাণ করেছে যে, কুরআনই স্রষ্টা প্রদত্ত একমাত্র অবিকৃত ঐশী বাণী। তাই কুরআন এর সাথে সাথে কুরআনের রচয়ীতা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সত্যতা দিবালকের ন্যায় হয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিস্কার গুলো যেন নিরবে বলে চলছে যে, কুরআন ও বিজ্ঞান একই উৎস থেকে নির্গত। তাই কুরআন অবতীর্ণকারী মহান আল্লাহকে অস্বীকার করা যেন বিজ্ঞানকেই অস্বীকার করার শামিল।